কসমস: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন - ১

 

 

১.১  ভূমিকা

 

শহর থেকে অনেক দূরে, দূষণ ও কৃত্রিম আলো নির্মুক্ত পরিবেশে, কোন এক মেঘমুক্ত রাতে, কেউ যদি আকাশের দিকে তাকান, হীরক খচিত  কালো আকাশের দর্শনীয় দৃশ্যে চমকিত  হবেন। অভিভূত হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা না করে পারবেন না, "এটা কে করেছে?" প্রকৃতপক্ষে, তার প্রথম জ্ঞান উন্মেষন থেকে মানুষ জিজ্ঞাসা করে এসেছে, "এই মহাবিশ্ব কে তৈরি করেছেন? কোথা থেকে এসেছে? এটি কীভাবে এবং কেন শুরু হয়েছিল? এটি কি শেষ হবে এবং যদি তা হয় তবে কিভাবে?" যুগে যুগে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে।

শুরুতে যখন প্রথম মানুষ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল, তারা দেখত কিন্তু বুঝতে পারত না কেন সঠিক নিয়মে মহিমান্বিত সূর্য সকালে পূর্ব দিকে উঠে আকাশের পথে তপ্ত কিরণ বিকিরন করতে করতে পশ্চিম দিকে উড়ে যায়। তারা বুঝতে পারত না কেন সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে তার ঘর রাত্রির অন্ধকারে ভরে যায়। বুঝতে পারত না, আকাশ কেন ভরে যায় কুচি-কুচি আলোর কণায়। তারা কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারত আর অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যে অবাক হতে পারত। বিশাল মহাদেশ, বিরাট পাহাড়, সীমাহীন সমুদ্র, তাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দিত। বিভিন্ন  রোগ, ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, বজ্রপাত তাদের সরাসরি হুমকি দিত। মানবজাতির ইতিহাসের খুব প্রথম দিকে, প্রকৃতি সম্বন্ধে অজ্ঞতা, অজানা সম্পর্কে ভয়, মানুষকে ধার্মিক করে তুলেছিল, তারা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে কল্পনা করেছিল। ঈশ্বর প্রকৃতি সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তিনি তাদের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করেন। ঈশ্বর যখন সন্তুষ্ট থাকেন তখন তাদের সহজ শিকার, প্রচুর ফলমূল দিয়ে পুরস্কৃত করেন, আর যখন অসন্তুষ্ট হন তখন বৃষ্টিপাত, বন্যা, বজ্রপাত এবং বিভিন্ন রোগ দিয়ে শাস্তি দেন। প্রাথমিকভাবে, আদিম সমাজগুলিতে  অনেক অনেক ঈশ্বর ছিলেন (বর্তমানেও যার নিদর্শন অনেক ধর্মে দেখতে পারি) সূর্য চাঁদের মতো জ্যোতিষ্ককে তারা ঈশ্বর মনে করত, আগুন, বৃষ্টি, বজ্রপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক ঘটনাও তাদের কাছে ছিল ঈশ্বর বা দেবতা। ঈশ্বর কল্পনা করে আদিম মানুষেরা শুরুতে জিগ্যেস করা প্রশ্নগুলোর (এই মহাবিশ্ব কে তৈরি করেছেন? কোথা থেকে এসেছে? এটি কীভাবে এবং কেন শুরু হয়েছিল? এটি কি শেষ হবে এবং যদি তা হয় তবে কিভাবে?) উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আর সেই উত্তরে ঈশ্বর বা দেবতার ভূমিকা ছিল মূখ্য। ঈশ্বর এই বিশ্বজগতের একমাত্র স্রষ্টা এবং রক্ষাকারী। খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ জেনেসিস তাই শুরু হয়,

                      শুরুতে ঈশ্বর আকাশ ও মাটি তৈরী করেছিলেন।

তারপর ব্যাখ্যা করে কিভাবে টানা ছয় দিনে ঈশ্বর বিশ্ব এবং এর সমস্ত বিষয়বস্তু তৈরি করেছিলেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। বাইবেলের মতে কোনকিছু ছাড়াই প্রকৃত শূণ্য থেকেই ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন।  হিন্দুধর্ম, বিশ্বের আরেকটি প্রাচীন ধর্ম এই শূণ্য থেকে পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। প্রকৃতপক্ষে, অনেক পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে সৃষ্টি সম্বন্ধে হিন্দুদের ধারণাটিই সবচেয়ে আধুনিক এবং বিশ্বজগত সৃষ্টি সম্বন্ধে বর্তমানে স্বীকৃত তত্ত্বগুলির অনেক কাছাকাছি। প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিদ, সাহিত্যিক কার্ল সাগান তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কসমসে’ তাই লিখেছেন,

“হিন্দু ধর্মই বিশ্বের একমাত্র মহান ধর্ম যা বিশ্বাস করে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড   অনন্তকাল ধরে অসংখ্য সংখ্যক মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে চলেছে।  এটিই একমাত্র ধর্ম যেখানে সময়ের মাপ আধুনিক বিজ্ঞানের সময়ের মাপের সাথে কিছটা মেলে।“

ৠকবেদ হিন্দুদের একটি বিশিষ্ট  ধর্মগ্রন্থ। এটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা। আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রন্থটি রচিত হয়। গ্রন্থটি কিছু স্তব বা স্তুতিগানের সংগ্রহ। স্তবগুলিতে  বিভিন্ন হিন্দু দেবতা, অগ্নি, বরুণ, বায়ু; ইন্দ্র- ইত্যাদি দেবতার প্রশংসা করা হয়েছে।  একটি বিশেষ স্তব (১০-১২৯), বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের মুগ্ধ করেছে। স্তবটি একটি অলঙ্ঘনীয়  আপাতবিরুধিতা (প্যারাডাক্স) প্রকাশ করে: শূণ্য থেকে কি ভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে? কীভাবে কোনকিছু শুরু হতে পারে যখন আগে কিছুই ছিল না? স্তবটির অনুবাদ এইরকম  

"প্রকৃতপক্ষে কে জানে এবং কে ঘোষণা করতে পারে, কোথা থেকে  এই সৃষ্টি এসেছে?  পৃথিবী সৃষ্টির পরেই দেবতাদের সৃষ্টি।  তাহলে কে জানে যে এটি কোথা থেকে এসেছে? যেহেতু সমস্ত সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল, স্রষ্টা, তিনি তা তৈরি করেছিলেন বা করেন নি। স্রষ্টা, যিনি সমস্ত কিছু সর্বোচ্চ স্বর্গ থেকে দেখছেন, সম্ভবত তিনি জানেন - অথবা তিনিও  জানেন না।“

সময়ের সাথে সাথে, বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার সাথে মানুষ ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো  বুঝতে শুরু করে। ক্রমশ তার বৈজ্ঞানিক মানসিকতা গঠন হতে থাকে। । বৈজ্ঞানিক মানসিকতা যত দৃঢ়   হতে থাকে, ঈশ্বর বা দেবতার প্রাসঙ্গিকতা মানুষের জীবনের ততই কমতে থাকে।  তবে এটা মনে করা ভুল হবে যে মানুষ পুরোপুরি ধর্মমুক্ত হয়েছে বা ভবিষ্যতে হবে। ধর্ম অবিশ্বাস্যরূপে স্থিতিস্থাপক। রাশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশগুলো মানুষের জীবন ধর্ম থেকে মুক্ত করার জন্য বিশেষ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। কোন কোন সামাজবিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে স্বকীয়-প্রকৃতিতে মানুষ  ধর্মীয়।

প্রকৃতির সাথে হাজার হাজার বছরের নিরবচ্ছিন্ন ক্রিয়াপ্রক্রিয়ায় আমরা মানবজাতি বর্তমানে প্রকৃতি সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছি। এই জ্ঞান অবশ্যই অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই অসম্পূর্ণ জ্ঞান থেকেই আমরা প্রকৃতির কিছু গভীর রহস্য উদঘাটনে সক্ষ্মম হয়েছি।  বিশ্বব্রহ্মান্ড এবং বিশ্বব্রহ্মান্ডের মধ্যে আমাদের স্থান সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কর এবং অপ্রত্যাশিত তথ্য আবিষ্কার করেছি। আমরা এখন জানি পৃথিবী - আমাদের আবাসস্থল, সূর্যের অনেকগুলি  গ্রহর মধ্যে একটি গ্রহ মাত্র আর  সূর্য নিজেই মহাবিশ্বের কোটি কোটি তারার মধ্যে একটি তারা। আমরা জানি যে আমাদের সৌরজগৎ প্রায় ৪৫০০০০০ ( ৪.৫ মিলিয়ন) বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এটি মিল্কিওয়ে নামক একটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের একটি ক্ষুদ্র উপাদান মাত্র। আমরা জানি যে মিল্কিওয়ের মত ১০০,০০০,০০০,০০০  (১০০ বিলিয়ন)   গ্যালাক্সি দিয়ে তৈরী আমাদের বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্ব। আমরা এ ও জেনেছি যে মহাবিশ্ব নিজেই প্রায় ১৩.৭  বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের সাথে অস্তিত্বে এসেছিল আর ছায়াপথগুলি ক্রমবর্ধমান গতির সাথে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাছে। একজন সাধারণ মানুষ জানতে চান যে প্রকৃতির এই রহস্যগুলো জানার প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটেছিল। তাদের এই জানার আগ্রহকে তুষ্ট করতে আমরা মানবজাতির বিশ্বব্রহ্মান্ডের রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টার একটি বৌদ্ধিক ভ্রমণ করব।

 

১.২ মানবজাতির আদি ইতিহাস

৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে প্রকৃতির কোন এক কৌতুকে পৃথিবী যখন তৈরী হয় তখন এটি প্রাণবন্ত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, জন্মের সময়ের পৃথিবী আমরা এখন যে পৃথিবী জানি তা থেকে  সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এটি ছিল উত্তপ্ত, তরল এবং ক্রমাগত উল্কাবর্ষণের শিকার। বছরের পর বছর ধরে পৃথিবী শীতল হয়েছে, উল্কাবর্ষন হ্রাস পেয়েছে, উপরিভাগ কঠিন় হয়েছে। প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম জীবনের উন্মেষ হয় এককোষী অ্যামিবা বা ব্যাকটিরিয়ার আকারে। এই এককোষী জীবনকে বহুকোষী জীবনে বিকশিত হতে সময় নিয়েছিল প্রায় এক বিলিয়ন বছর। কি প্রক্রিয়ায় এই বিবর্তনটি ঘটেছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় নি। এই সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে অনেক বায়ুমণ্ডলীয় এবং ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছিল। সেই পরিবর্তনগুলি অবশ্যই এক কোষী জীবনকে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে বহু-কোষী জীবনে বিকশিত করতে সাহায্য করেছিল। বহুকোষী জীবনে বিবর্তনের জন্য দুটো শর্ত অবশ্যই মানা দরকার। শর্তদুটো হল, (১) এল্যাই্নমেন্ট অফ ফিটনেস, ও (২) এক্সপোর্ট অফ ফিটনেস। বহুকোষী জীবনকে সফল হওয়ার জন্য কোষগুলোকে  একে অপরকে মান্যতা করা, পরস্পরের সাথে যোগাযোগ ও  সহযোগিতা করা এই শর্ত গুলি মেনে চলা দরকার। একেই বলা হয় এল্যাই্নমেন্ট অফ ফিটনেস । বহুকোষী জীবকে জীবনের ধারা বজায় রাখার জন্য কোষগুলিকে প্রজননের সাধারণ লক্ষ্যে একসাথে কাজ করতে হবে, জনকজননীর প্রতিচ্ছবিতে আরও বহুকোষী জীব তৈরি করতে হবে।   একেই বলা হয় এক্সপোর্ট অফ ফিটনেস। বর্তমানে আমরা যে ধরণের জীবনের সাথে পরিচিত সে সমস্ত জীবন পৃথিবীতে অনেক পরে আবির্ভূত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় 530 মিলিয়ন বছর আগে  মাছ পৃথিবীতে হাজির হয়েছিল। ২০০ মিলিয়ন বছর পর্যন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিকাশ হয়নি। আমাদের নিজস্ব প্রজাতি, মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স, মাত্র 200,000 বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিল। মানুষ গ্রেট এপ বা বনমানুষ পরিবারের বংশধর; হোমিনিড বা দ্বিপাদিক -- পিছনের অঙ্গ বা পায়ে চলার ক্ষমতা রাখে। মানব বিবর্তনের 'আউট অফ আফ্রিকা' তত্ত্বে, প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে, আফ্রিকা অঞ্চলে হোমো বংশের হোমো হাবিলিস প্রথম  উদ্ভূত  হয়েছিল। লাতিন ভাষায় হোমো অর্থে 'মানুষ' এবং হাবিলিস অর্থে 'হ্যান্ডি' বা হাত ব্যাবহারে পারদর্শি। হোমো হাবিলিসের সাথে আধুনিক মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যদিও  'এপ' জাতীর কিছু বৈশিষ্ট্, যেমন লম্বা হাত,   সামনের দিকে প্রসারিত চোয়াল ইত্যাদি তাদের মধ্যে ছিল। হোমো হাবিলিসরাই প্রথম  পাথরের অস্ত্র বা যন্ত্র তৈরী করে। তাই তাদের   'হ্যান্ডি ম্যানও বলা হয়।

বিবর্তনের ধারায় অনেক বছর ধরে, হোমো হাবিলিস হোমো ইরেক্টাসে পরিবর্তিত হয়। হোমো ইরেক্টাসরা সোজা হয়ে হাঁটতে সক্ষম ছিল। বর্তমানে বিলুপ্ত, হোমো ইরেক্টাস প্রজাতি ১.৯-০.০৭ মিলিওন বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত। এরা আফ্রিকা সহ ইউরেশিয়ান অঞ্চল ও ভারত, চীন এবং ইন্দোনেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বছর ধরে, প্রায় 0.৩৬- 0.৪4 মিলিওন বছর পরে হোমো ইরেক্টাসরা হোমো নিয়ান্ডারথ্যালেনসিস বা নিয়ান্ডারথালসে বিবর্তিত হয়েছিল। হোমো নিয়ান্ডারথ্যালেনসিস বা নিয়ান্ডারথালসরাই হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের পূর্বসূরী। আজ থেকে  প্রায় 0.২ মিলিয়ন বছর আগে এই বিবর্তন ঘটেছিল।

 

মানুষই পৃথিবীর মূলসূত্র। বিশ্বব্রম্বান্ডের লক্ষ লক্ষ লক্ষ গ্রহের মধ্যে পৃথিবীর বিশিষ্টতা এই যে   এই সুন্দর প্রাণীটি পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, যারা ভাবতে পারে, চিন্তা করতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাসকে তিনটি যুগে বিভক্ত করেছেন, (১) প্রাগৈতিহাসিক, (২)  মধ্য-ঐতিহাসিক  এবং (৩) ঐতিহাসিক। ঐতিহাসিক যুগটি সেই সময়কাল, যখন মানুষ লিখবার দক্ষতা অর্জন করেছিল। মানুষের লেখার প্রমাণ আধুনিক সময়ে বিভিন্ন খননকার্য থেকে (মূলতঃ গত চার-পাঁচশো বছরের মধ্যে) প্রাপ্ত হয়েছিল। প্রাগৈতিহাসিক, ও  ঐতিহাসিক যুগের মধ্যেকার কিছু সময়কে বলা হয় মধ্য-ঐতিহাসিক  যুগ। মধ্য-ঐতিহাসিক  যুগে মানব সভ্যতা যথেষ্ট উন্নত, কিন্তু লেখন প্রনালী আয়ত্ত্বের বাইরে ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগটি দীর্ঘকাল বিস্তৃত ছিল এবং একে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়, পুরাতন প্রস্তর যুগ, মধ্য প্রস্তর যুগ ও নতুন প্রস্তর যুগ। "পুরাতন প্রস্তর" যুগে মানবজাতি সবচাইতে বর্বর অবস্থায় ছিল।  অন্যান্য প্রাণীর সাথে, প্রচুর প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের বাস করতে হত।   পৃথিবী তাদের কাছে নিরাপদ স্থান ছিল না। দৈহিক কাঠামোর কথা বিবেচনা করলে  অবাক হতে হয় যে মানবজাতি বেঁচেছিল এবং সমৃদ্ধ হয়েছিল। একটি মানুষ হাতি বা গন্ডারের মত  শক্তিশালী নয়, হরিনের মত দ্রুত চলতে পারে না, সিংহের মত তার নখ ও দাঁত নেই। সেই প্রতিকুল পরিবেশে তাঁর হিংস্র সহচরদের চেয়ে একটি মাত্র জিনিসে সে এগিয়ে ছিল। সেটি তার বুদ্ধিমত্তা। উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার দ্বারাই মানুষ  তাঁর শারীরিক দুর্বলতা অতিক্রম করে তাঁর শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এবং সফল হইয়েছিল।    পুরাতন প্রস্তর যুগে মানুষ গুহায় দল বেঁধে থাকত (বন্য প্রাণীকে ভয় দেখাতে)। পশু হত্যা বা শত্রু প্রতিহত করার জন্য সে সাধারন পাথর ব্যবহার করত। তার ক্ষুধা নিবৃত হত  শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে। সঠিক কোন পর্যায়ে মানুষ "আগুন" ব্যবহার শিখেছিল  বলা শক্ত, তবে পুরাতন প্রস্তর যুগের মাঝামাঝি কোন এক সময় মানুষ "আগুন" ব্যবহার শিখেছিল।   আগুনের তার সাথে আগেও পরিচিতি ছিল। বজ্রপাতে গাছে আগুন লাগার ঘটনা সে দেখেছে। প্রয়োজনে আগুন জ্বালানো এবং সেই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ এটাই সে শিখেছিল। আগুনের ব্যবহার শেখা মানব জাতির একটি বিশেষ ঘটনা। বিভিন্ন ভাবে এটি মানব সমাজকে প্রভাবিত করেছিল ও  তাদের অনেক শক্তিশালী করে তুলেছিল। বন্য প্রাণীরা সবসময়ই আগুনকে ভয় পায়। আগুনের ব্যবহার তাদের রাতের বেলায় কাজ করতে সক্ষম করে। তাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়। আগুন তাকে শীতের রাতে উষ্ণতা দেয়।  আগুনের ব্যবহার তাদের স্বাস্থ্যকরও করে তুলেছিল।  এখন সে রান্না করা মাংস খেতে পারে যা ই-কোলি বা সালমোনেলা     প্রভৃতি ব্যাকটিরিয়া মুক্ত, এবং অনেকবেশি সুস্বাদু ও সুপাচ্য।

 

পুরাতন প্রস্তরযুগটি খ্রিস্টপূর্ব ১0000 অবধি অব্যাহত ছিল। এর পরে শুরু হয়   মধ্য প্রস্তর যুগ। মধ্য প্রস্তর যুগে মানুষ তাদের পাথরের প্রয়োগগুলিকে আরও বেশি কার্যকর ও  মারাত্মক করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল, যেমন  শক্ত পাথরে ঘষে ধারালো করা, চামড়ার ফিতে লাগিয়ে গুলতি বানানো ইত্যাদি।   তারা কাঠ এবং পাতা ব্যবহার করে আধা-স্থায়ী ঘর তৈরি করতে শিখেছিল। মধ্যপ্রস্তর যুগে মানুষ মাছ খাওয়া শিখে যা তাদের খাবারের উৎস বাড়িয়ে তোলে। এই যুগে সম্ভবত নৌকা ব্যবহারও শুরু করেছিল। মধ্য প্রস্তর যুগ সম্ভবত ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব অবধি অব্যাহত ছিল। এই যুগের শেষের দিকে মানুষ কৃষিকাজ শিখেছ। কৃষি মানুষকে পৃথিবীর অন্যান্য বাসিন্দাদের তুলনায় অনেক এগিয়ে নিয়ে গেল এবং তাদের জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বদলে দিল। কৃষিকাজের আগে মানুষ ছিল  যাযাবর।  তাদের খাদ্যের সন্ধানে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যেতে হত। কৃষিকর্ম, নিজের খাদ্য নিজে তৈরী করার ক্ষমতা তাদের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটাল। জল-কৃষিকাজের জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় উপাদান। তারা নদীর উপত্যকার আশেপাশে, যেখানে জলের সরাবরহ নিশ্চিত,  বসতি স্থাপন শুরু করল।  সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা তাই গড়ে উঠেছিল নদীর তীরে, যেমন টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের পাশে, মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা (আধুনিক ইরাকের অংশ), সিন্ধু নদীর তীরে সিন্ধু সভ্যতা (বর্তমানে পাকিস্তানে), নীল নদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা এবং চীনের হুয়ান হি নদীর তীরে হুয়ান হি সভ্যতা ইত্যাদি।

 

নতুন প্রস্তর যুগে মানব সভ্যতা খুব দ্রুত অগ্রসর হয়। এই সময় তারা মৃৎশিল্প শিখেছে। শস্য সংগ্রহ করার জন্য তারা বিভিন্ন রকম মৃৎপাত্র বানাত।  তারা পশুপালন  শিখে,গরু, ছাগল, ভেড়া, গাধা এবং অন্যান্য প্রাণীকে পোষ মানিয়ে তাদের খাদ্য ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ করে। পুরাতন ও মধ্য প্রস্তরযুগে পারিবারের ধারণাটি সংজ্ঞায়িত হয়নি, নতুন প্রস্তরযুগে পরিবারের ধারণাটি পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত হয়। এইযুগে মানুষ ধাতুর ব্যবহারও শিখেছিলেন। নতুন প্রস্তর যুগ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অবধি অব্যাহত ছিল। লিখন শিল্প মানবজাতির আয়ত্ত্বে এলে  প্রাগৈতিহাসিক যুগ ঐতিহাসিক যুগে রূপান্তরিত হয়। মধ্য- ঐতিহাসিক যুগ প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যবর্তী অল্পকিছু সময়কে বোঝায়। বিশেষত, নির্দিষ্ট কিছু সভ্যতায় উদাহরণস্বরূপ সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা যদিও যথেষ্ট উন্নত ছিল কিন্তু তারা লেখার শিল্প শেখেনি। মুখে-মুখে তাদের জ্ঞান সংক্রামিত হত।

 

নতুন প্রস্তর যুগের শেষ দিকে, ধাতুবিদ্যায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়। কিছু কিছু অঞ্চলে মানুষ তামা, ব্রোঞ্জ এবং এমনকি লোহার সরঞ্জাম তৈরি করা শিখেছিল। সভ্যতার বিকাশে ধাতুর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিশ্চিয়ান থমসন, ধাতুর  ব্যবহারের ভিত্তিতে মানবজাতির ইতিহাস তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন (১) প্রস্তর যুগ (৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ অবধি), (২) ব্রোঞ্জ যুগ (৩০০০-১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং (৩) লৌহ যুগ (১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ – বর্তমান সময়)। থমসন কোপেনহেগেনের ডেনমার্কের জাতীয় জাদুঘরের কিউরেটর ছিলেন এবং যাদুঘরের বিশাল পুরাকীর্তি সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন। প্রস্তর যুগে ধাতুর ব্যাবহার অজানা ছিল। ব্রোঞ্জ যুগে মানুষ ধাতুর ব্যবহার শিখেছিল। তামা ও টিন মিলিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরির কৌশল অ আয়ত্ত্ব করেছিল। প্রযুক্তিতে যথেষ্ট উন্নতি হওয়ার পরেই লৌহযুগ শুরু  হয়েছিল। ধাতুর সাথে মানুষের প্রথম সাক্ষাতটি অবশ্যই আকস্মিক ঘটনা।  সম্ভবত তারা হঠাৎই সোনা বা তামার তাল খুঁজে পেয়েছিল (প্রকৃতিতে এই দুইটি ধাতু মাঝে মধ্যে স্বাধীনভাবে পাওয়া যায়),  এবং তাদের রঙ ও দীপ্তিতে আকৃষ্ট হয়েছিল। প্রথম দিকে সম্ভবত শরীরের শোভাবর্ধন করার জন্য এদের ব্যবহার হত। সময়ের সাথে সাথে তারা শিখল যে তামা ও  সোনা খুব নমনীয় এবং পিটিয়ে তা দিয়ে পাত বানানো যেতে পারে।  তারা দ্রুত শিখেছিল যে তামা দিয়ে ধারালো ও তীক্ষ্ণ অস্ত্র তৈরি করা যায়।  মুক্ত তামা খুবই বিরল তাই তামার বিস্তৃত   ব্যবহার সম্ভব ছিল না। মানুষ কি করে জানতে পেরেছিল যে কিছু কিছু পাথর (আকরিক তামা) পুড়িয়ে তামা পাওয়া যায় বা কি করে জানতে পেরেছিল ব্রোঞ্জ তৈরির হদিস  আমরা  তা জানি না। ব্রোঞ্জ তামা এবং টিনের একটি খাদ। সম্ভবত, কোনও একদিন, মানুষ  কিছু নীলচে পাথর (তামার আকরিক) এবং বাদামী কালো পাথরের (টিনের আকরিক) উপর  আগুন জ্বেলেছিল এবং পরে উজ্জ্বল ধাতব ব্রোঞ্জ খুঁজে পেয়েছিল। একই ভাবে সম্ভবত তারা তামার আকর থেকে তামা থেকে তামা বানাবার রহস্য শিখে। শীঘ্রই মানব জীবনে ব্রোঞ্জের ব্যাপক ব্যবহার, নানা রকম তৈজসপত্র, অস্ত্র ইত্যাদিতে ব্রোঞ্জের ব্যবহার শুরু হয়।  মানব সভ্যতার  বিকাশের পরবর্তী পর্যায় - লৌহ যুগের জন্য মানুষকে কয়েক হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। লোহা  খাঁটি আকারে পাওয়া যায় না এবং লোহার আকরিকগুলি তামা বা টিনের চেয়ে অনেক দৃঢ় ভাবে আবদ্ধ থাকে। লোহার আকরিক গলানোর জন্য  অনেক বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, তামার আকরিক ১০০০ ডিগী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গলে যায়, প্রয়োজনে  সাধারন কাঠের আগুনে যে তাপমাত্রা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু একটি সাধারণ কাঠের আগুনে লোহার আকরিক গলানো সম্ভব নয়। লোহার আকরিকের জন্য প্রয়োজন ১৫০০ ডিগী সেন্টিগ্রেড তাপমান। একমাত্র কাঠকয়লার আগুনে বায়ু চলাচলের সুব্যবস্থা থাকলেই যেটি করা যায়। ঘটনাচক্রে, লৌহ যুগ পুরো বিশ্ব জুড়ে একসাথে শুরু হয়নি। আগে, মনে করা হত  হয়েছিল যে ১২০০-১০০ খ্রীষ্টপূর্বাদে আনাতোলিয়ান অঞ্চলে (বর্তমানে তুরস্কে)  নিয়মিত  ভাবে লোহার উৎপাদন ও  ব্যবহার শুরু হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তি অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে; ভারতীয়রা লোহার ব্যবহার শিখে ১০০০-৮০০ খ্রিস্টপূর্বাদে, আরও প্রায় পরে ৬০০ বছর পরে চিন দেশে এই প্রযুক্তি যায়। মধ্য ভারতে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানগুলি ইঙ্গিত দেয় যে লোহার গলানো ও লোহার ব্যবহার ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বের প্রথম দিকে ভারতের গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রচলিত ছিল।

ভাষা নিয়ে কিছু বক্তব্য রেখে এই অধ্যায়টি শেষ করব। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্ত্বপূর্ণ পার্থক্য এই যে সমস্ত মানুষের যোগাযোগের জন্য ভাষা রয়েছে কিন্তু  জীবজন্তুর নেই। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে কিছু কিছু জন্তু শব্দ করে যোগাযোগ করতে পারে, কিন্তু জন্তুদের যোগাযোগের সেই শব্দ আর মানুষের ভাষার মধ্যে বিপুল পার্থক্য রয়েছে। অনেকে মনে  করেন যে কথার মাধ্যমে যোগাযোগটি স্বতন্ত্রভাবে মানবিক। এটি মানব ও প্রাণীর মধ্যে একক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন রেখা।

মানুষ কখন এবং কীভাবে কথার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে শিখেছে? কখন তার  ভাষার বিকাশ ঘটেছিল এই সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। বেশিরভাগ ধর্মে মানুষকে ভাষা আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় না, বরং এটি একটি ঈশ্বরীয় দান মনে করা হয়। খ্রীস্টানদের বাইবেলে   আমরা পাই,

 "ঈশ্বর মানুষকে তাঁর প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন”

মানুষ ঈশ্বরের গুণাবলীতে ভূষিত হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ছিল কথা বলার ক্ষমতা। হিন্দু ধর্মে সরস্বতী বা বাক দেবী হলেন বাকশক্তির দেবী। ৠকবেদে দেবী সরস্বতীর অসংখ্য উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে সরস্বতী নদীর সাথে যুক্ত ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ স্তবক: ৠকবেদের একটি শ্লোকে আছে,  

"শ্রেষ্ট মা, নদীর মধ্যে শ্রেষ্ট, শ্রেষ্ট দেবী সরস্বতী,  আপনি আমাদের খ্যাতি দিন।"

পরবর্তীকালের বৈদিক সাহিত্য   সরস্বতীকে বাকশক্তির দেবী করা হয়েছিল। সংস্কৃতে বাক-এর     অর্থ বাক্য বা বক্তৃতা, তাই তাকে 'বাক দেবী' নাম দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আধুনিক ভারতে সরস্বতী বা বাক দেবীকে শিক্ষার দেবী হিসাবে পূজা করা হয়।

ভাষার উৎস, কীভাবে এবং কখন মানুষ কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করেছিল, তা কয়েক শতাব্দী ধরে পণ্ডিতদের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই আলোচনা এতটাই অফলপ্রসু ও নিরর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে ১৮৮৬ সালে, প্যারিসের ল্যাঙ্গুইস্টিক সোসাইটি, তৎকালীন সর্বাধিক সম্মানীয় প্রতিষ্ঠান,  ভাষা-উৎস সম্পর্কিত সমস্ত রকম গবেষণাপত্র নিষিদ্ধ করেছিল।   ভাষার উৎস সম্পর্কিত গবেষণার প্রাথমিক অসুবিধা হ'ল প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব। আদিম মানুষের অনেক কথাই আমরা জানতে পেরেছি তাদের ফেলে যাওয়া  জীবাশ্ম থেকে। কিন্তু মানুষের কথ্য ভাষাগুলি কোন জীবাশ্ম ছেড়ে যায় না। জীবাশ্মের খুলি মস্তিষ্কের আকার   সম্পর্কে আমাদের জানায়, কিন্তু মস্তিষ্ক কী করতে পারে তা জানায় না। ভাষার উৎস ডারউইনের বিবর্তনবাদের একটি প্রধান বাধা। যে প্রাণীটি কথা বলার ক্ষমতায় মানুষের কিছু কাছাকাছি আসে সে কোন স্তন্যপায়ী জন্তু নয়, সে পাখি, বিবর্তনবাদের সারিতে মানুষের থেকে অনেক দূরে। ভাষার উৎস বা মূল সম্পর্কে বেশ কয়েকটি অনুমানমূলক তত্ত্ব রয়েছে। এগুলিকে বিস্তৃতভাবে দুই প্রকারে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়; (১) ধারাবাহিকতার তত্ত্ব – এই তত্ত্বটি ডারউইনীয় দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মনে করা হয় প্রাণীজগতের যোগাযোগের কোন এক আদিম রূপ থেকে এর বিকাশ হয়েছে,  (২) বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব  - ধারাবাহিকতার তত্ত্বএর বিপরীত এই তত্ত্ব। মনে করা হয় যে ভাষা একমাত্র মানুষেরই বৈশিষ্ট, অন্যান্য প্রানীদের নয়।  বিবর্তনের পথে অকস্মাৎ ভাষার আবির্ভাব হয়েছিল।  আমি এই তত্ত্বগুলি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করব না। আমি কেবল এটিই বলব যে ভাষার উৎস এখনও বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হয়।

Comments